stvadmin
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩:০৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রায়গঞ্জের মকিমপুর জমিদারবাড়ি: দেড়শ বছরের ইতিহাস আজ ধ্বংসের পথে

রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার উত্তরে মকিমপুর গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো মকিমপুর জমিদারবাড়ি। সময়ের সঙ্গে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, বদলে গেছে চারপাশের পরিবেশ; তবে অতীতের স্মৃতি ও স্থাপত্যের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি।

তবে দীর্ঘদিনের অযত্ন ও ক্ষয়ক্ষতির কারণে বর্তমানে জমিদারবাড়িটির মূল ভবনটি জীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস-সংস্কৃতিসচেতন মানুষের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে কালের সাক্ষী এই স্থাপনাটি একদিন হারিয়ে যেতে পারে।

১৮৮৫ সালে নির্মিত জমিদারবাড়ি

বর্তমান জমিদার পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জমিদার গোবিন্দ রায় চৌধুরী মকিমপুরের মূল জমিদারবাড়িটি নির্মাণ করেন। মূল ভবনটি নির্মিত হয় ১৮৮৫ সালে।

ভবনটিতে রয়েছে মোট সাতটি কক্ষ। জমিদার পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম কয়েক বছর আগেও এখানে বসবাস করতেন। কিন্তু ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় বর্তমানে পরিবারের সদস্যরা মূল ভবনের উত্তর ও পশ্চিম পাশে নির্মিত আলাদা বাড়িতে বসবাস করছেন।

জানা যায়, জমিদার গোবিন্দ রায় চৌধুরীর দুই ছেলে ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই একজন ছেলে মারা যান। অপর ছেলের বংশধরেরা এখনো মকিমপুরে বসবাস করছেন। ফলে জমিদারবাড়ির সঙ্গে পরিবারের বংশধরদের পারিবারিক সম্পর্ক এখনো বিদ্যমান।

জমিদারবাড়ির সামনে ১৮৮৭ সালের মন্দির

জমিদারবাড়ির সামনে রয়েছে একটি প্রাচীন মন্দির। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৭ সালে মন্দিরটি নির্মাণ করা হয়—জমিদারবাড়ি নির্মাণের মাত্র দুই বছর পর।

মন্দিরটিতে এখনো পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে লক্ষ্মীপূজা বেশ আয়োজন করে পালন করা হয়। এ সময় জমিদার পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ও আত্মীয়স্বজনদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য অমল কুমার রায় জানান, তাঁদের দাদু জমিদারবাড়ি ও মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য ধরে এখনো লক্ষ্মীপূজার আয়োজন করা হয়।

ধ্বংসের পথে ঐতিহাসিক স্থাপনা

একসময় জমিদার পরিবারের বসবাসে মুখর থাকা ভবনটি বর্তমানে জীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিনের ক্ষয়ক্ষতির কারণে ভবনের বিভিন্ন অংশের চুন-সুরকি খসে পড়েছে। কোথাও কোথাও বেরিয়ে এসেছে পুরোনো লাল ইট।

প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেলেও পুরোনো স্থাপত্য ও ইতিহাসের কারণে এখনো দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে আছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মকিমপুর জমিদারবাড়ি ও মন্দির দেখতে আসেন। তারা পুরোনো স্থাপনা ঘুরে দেখার পাশাপাশি এর ইতিহাস সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।

সংরক্ষণের প্রয়োজন

ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা গবেষক ও শিক্ষক খ ম রেজাউল করিম মনে করেন, মকিমপুর জমিদারবাড়ি ও মন্দিরের নির্মাণশৈলীতে আগের দিনের স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন রয়েছে। সময়ের বিবর্তনে স্থাপনাগুলো ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

সরকারি তালিকাতেও রয়েছে মকিমপুরের মন্দির

রায়গঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে ‘মকিমপুর জমিদার বাড়ীর মন্দির’-কে উপজেলার পর্যটন স্পট হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এটি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার উত্তরে রায়গঞ্জ পৌরসভার আওতাধীন মকিমপুর গ্রামে অবস্থিত। উপজেলা সদর থেকে বাস, সিএনজি, রিকশা ও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে সেখানে যাওয়া যায়।

উপজেলা প্রশাসনের ‘উপজেলার ঐতিহ্য’ বিষয়ক তথ্যেও মকিমপুর জমিদারবাড়ির মন্দিরকে অত্যন্ত প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গোবিন্দ রায় চৌধুরীকে ঘিরে নানা জনশ্রুতি

জমিদার গোবিন্দ রায় চৌধুরীকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে নানা ধরনের জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। কেউ তাঁকে প্রজাদরদি জমিদার হিসেবে বর্ণনা করেন। আবার প্রচলিত আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, তাঁর প্রভাবের কারণে প্রজারা জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে ছাতা মাথায় ও জুতা পায়ে চলাচল করতে পারতেন না। খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রেও তিনি কঠোর ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে কথিত রয়েছে।

তবে এসব প্রমাণিত ঐতিহাসিক তথ্য নয়; স্থানীয় জনশ্রুতি। তাই এগুলোকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে দাবি করা ঠিক হবে না।

হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংরক্ষণ প্রয়োজন

মকিমপুর জমিদারবাড়ি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি রায়গঞ্জের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি দৃশ্যমান নিদর্শন। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটি বর্তমানে জীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতিসচেতন ব্যক্তিদের দাবি, দ্রুত সংস্কার ও যথাযথ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে মকিমপুর জমিদারবাড়ি ও ১৮৮৭ সালের মন্দিরটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে টিকে থাকতে পারে।

জমিদারি প্রথা নেই, সময়ও বদলে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মকিমপুর জমিদারবাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে। হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংরক্ষণ হোক রায়গঞ্জের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভূঞাপুরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের ব্রিফিং প্যারেড অনুষ্ঠিত

১

ভূঞাপুরে তিন ইউনিয়নের ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু

২

রায়গঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম বিশ্বাসের মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত

৩

রায়গঞ্জে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত

৪

রায়গঞ্জে নতুন ‘ভূঞাগাঁতী ইউনিয়ন’ গঠনের প্রস্তাবে গণশুনানি অনুষ্ঠিত

৫

ভূঞাপুরের ফলদার কুমারপাড়ায় মৃৎশিল্পীদের কর্মব্যস্ততা পরিদর্শনে ইউএনও মাহবুব হাসান

৬

উন্নয়ন ও জনসেবার অঙ্গীকার নিয়ে, রায়গঞ্জের সোনাখাড়া ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন রনি তালুকদার।

৭

রায়গঞ্জে নবযোগদানকৃত ৭৬ প্রাথমিক শিক্ষকের ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ

৮

রায়গঞ্জে বিভিন্ন মামলায় ৫ আসামি গ্রেপ্তার

৯

রায়গঞ্জে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক পুনর্বাসনকাজের উদ্বোধন

১০

ভূঞাপুরে মসজিদে মুসুল্লির মোটরসাইকেল চুরির চেষ্টার অভিযোগ, আটক ১

১১

রায়গঞ্জে বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত ৩ আসামি গ্রেফতার

১২

বাংলাদেশ পুলিশ মেধাবৃত্তিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে নির্বাচিত আ.ফ.ম. ইফতি বিন ইফতেখার

১৩

রায়গঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন অজ্ঞাত মোটরসাইকেল আরোহী

১৪

সম্মিলিত স্বেচ্ছাসেবী পরিষদের মিলনমেলা উপলক্ষে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

১৫

পাঙ্গাসী ইউনিয়নে জনগণের সেবক হতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন সালাউদ্দিন হাসিনুর

১৬

রায়গঞ্জের নিমগাছী গ্রামীণ ব্যাংকে অডিট চলাকালে ম্যানেজারের আত্মহত্যা, থানায় ৩ অডিট সদস্য

১৭

ভূঞাপুর পৌরসভায় ভোটার তালিকায় জালিয়াতির অভিযোগ: স্বাক্ষর জাল করে ভোটার স্থানান্তর, তদন্তে প্রশাসন

১৮

দুর্গাপূজায় নিরাপত্তার চাদরে রায়গঞ্জ, প্রস্তুতি সভায় প্রশাসনের নানা সিদ্ধান্ত

১৯

ভূঞাপুরে সামিয়ানা ছাড়া বালুবাহী ট্রাক চলাচল দুই ব্যক্তিকে জরিমানা

২০