
রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ মোঃ বাদশা ফাহাদ আব্বাসী। ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর রাজনৈতিক পথচলা সময়ের পরিক্রমায় বিস্তৃত হয়েছে সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, ব্যবসা ও জনসম্পৃক্ততায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে বর্তমানে তিনি চান্দাইকোনা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে কাজ করছেন।
তরুণ এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পথচলা কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, যুবসমাজকে সংগঠিত করা, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার প্রত্যয় নিয়েই তিনি এগিয়ে যেতে চান। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের নানা অধ্যায় রয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মোঃ বাদশা ফাহাদ আব্বাসীর জন্ম রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা এলাকার ঐতিহ্যবাহী ব্যারিস্টার বাড়িতে। তিনি একটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে বেড়ে ওঠেন। পারিবারিক পরিবেশ, পূর্বসূরিদের আদর্শ এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাঁর পিতা প্রয়াত শিক্ষক আলহাজ্ব আলী মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ মাস্টার। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি সন্তানকে শিক্ষাগত ও নৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতার মতো মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠার পেছনে বাবার অবদান রয়েছে বলে জানা যায়।
তিনি প্রখ্যাত ব্যারিস্টার আলী মোহাম্মদ আব্বাস ও আলী মোহাম্মদ আজহার সাহেবের সর্বকনিষ্ঠ ভাতিজা। ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি নিজের কর্ম ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিতি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি।
শিক্ষাজীবন ও নেতৃত্বের সূচনা
ফাহাদ আব্বাসীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তী সময়ে তিনি সলঙ্গা ইসলামিয়া হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। স্কুলজীবন থেকেই সহপাঠীদের সঙ্গে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব দেওয়ার আগ্রহ তাঁর মধ্যে লক্ষ্য করা যায়।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মিছিল-মিটিং ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সলঙ্গা ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত থাকেন। কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে সাংগঠনিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখেন। এরপর ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করেন। আইন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করেন।
ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা
২০০৯ সালে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ২৮তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় তাঁর জীবনীভিত্তিক বক্তব্য প্রদান করেন ফাহাদ আব্বাসী। ওই বক্তব্যের মাধ্যমে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে তিনি পরিচিতি লাভ করেন বলে তাঁর রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা জানান।
সলঙ্গা হাইস্কুল শাখা ছাত্রদলের কমিটি গঠনের পর তিনি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় স্থানীয় পর্যায়ে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও নতুন কর্মী সংগঠিত করার কাজে যুক্ত ছিলেন।
ছাত্ররাজনীতির এই পথচলায় তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন প্রয়াত মাহবুবুল আলম ওসমান, গোলাম সরোয়ার দুলাল, রঞ্জু আহমেদ, তারিফ মাহমুদসহ আরও অনেকে।
পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে চান্দাইকোনা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর রায়গঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ছাত্রসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার মধ্য দিয়ে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সাংগঠনিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা
২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন ও কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন বাদশা ফাহাদ আব্বাসী। বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য প্রদান এবং দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে তিনি তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পরিচিতি পান।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। নির্বাচনী প্রচারণায় দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে মাঠপর্যায়ের প্রচারণা এবং ভার্চুয়াল প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন। ওই সময় রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও হামলার ঘটনারও সাক্ষী হয়েছেন বলে তাঁর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২২ সালের ২ ডিসেম্বর সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। এসব ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক পথচলার উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কর্মকাণ্ড
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার উদ্দেশ্যে ২০১৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফোর্স ফর দ্য হেল্পলেস অব বাংলাদেশ’ (FHB) নামে একটি সামাজিক সংগঠন।
সংগঠনটির মাধ্যমে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানবিক সহায়তা প্রদান এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
যুবসমাজকে মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সূর্যসন্তান ক্লাব চান্দাইকোনা’। তাঁর মতে, একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মনে করেন, শুধু রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে সমাজের পরিবর্তন সম্ভব নয়; প্রয়োজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সামাজিক দায়িত্ব পালন এবং এলাকার সাধারণ মানুষের সমস্যা উপলব্ধি করা।
পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত পরিচয়
রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পেশাগত জীবনেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন বাদশা ফাহাদ আব্বাসী। বর্তমানে তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা জজ কোর্টের শিক্ষানবিশ আইনজীবী হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ত।
আইন বিষয়ে অধ্যয়ন ও আদালতকেন্দ্রিক পেশাগত অভিজ্ঞতা তাঁকে আইন, অধিকার এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন করেছে বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা মনে করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক। তাঁর স্ত্রী প্রয়াত চান্দাইকোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী কায়ছার আলীর পরিবারের সদস্য। পারিবারিক জীবন, পেশাগত দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করেই তিনি নিজের পথচলা অব্যাহত রেখেছেন।
হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের প্রত্যয়
চান্দাইকোনা ইউনিয়নের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ফাহাদ আব্বাসী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ইউনিয়নের উন্নয়ন কখনো একক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ।
হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, সামাজিক বিরোধ নিরসনে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন এবং এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, খেলাধুলার প্রসার, মাদক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতা ও উন্নয়নের প্রত্যাশা
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার চান্দাইকোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রত্যয় নিয়ে মাঠে রয়েছেন বাদশা ফাহাদ আব্বাসী।
তাঁর প্রত্যাশা, ইউনিয়ন পরিষদের নেতৃত্বের সুযোগ পেলে স্থানীয় মানুষের মতামত ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন। বিশেষ করে গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থার অগ্রগতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, যুবসমাজের কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চান।
এ ছাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সমন্বয় তৈরি, সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
তরুণ নেতৃত্বের সামনে নতুন প্রত্যাশা
স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ সময়ের দাবি। তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ একটি এলাকার উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বাদশা ফাহাদ আব্বাসীর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন অধ্যায়ে ছাত্ররাজনীতি, সামাজিক সংগঠন, ব্যবসা ও আইন পেশার অভিজ্ঞতার সমন্বয় দেখা যায়।
তবে রাজনৈতিক পরিচিতির পাশাপাশি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সব মানুষের জন্য সমানভাবে কাজ করার মানসিকতা।
সব মিলিয়ে চান্দাইকোনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মোঃ বাদশা ফাহাদ আব্বাসীর রাজনৈতিক ও সামাজিক পথচলা স্থানীয় রাজনীতিতে একটি আলোচিত অধ্যায়। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রত্যাশা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর সামনে এখন নতুন এক চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত এলাকার মানুষের সমর্থন ও প্রত্যাশার প্রতিফলন কীভাবে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।