
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের গোয়ালপাড়া এলাকায় পুরাতন ব্যাটারির প্লেট আগুনে পুড়িয়ে অবৈধভাবে সীসা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি উপেক্ষা করে একটি স্থাপনায় রাতের আঁধারে পুরাতন ব্যাটারির প্লেট পোড়ানো হচ্ছে। এতে বিষাক্ত ধোঁয়া ও বর্জ্যের কারণে কৃষিজমি, জলাশয়, ফসল, মাছ ও গবাদিপশুসহ স্থানীয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধামাইনগর ইউনিয়নের সীমানা এলাকায় স্থানীয়ভাবে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে পরিচিত মো. শাকিল তালুকদার ও মোমিনের নেতৃত্বে মাসিক প্রায় ৬ লাখ টাকা চুক্তিতে পুরাতন ব্যাটারি পুড়িয়ে সীসা তৈরির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কারখানাটির মালিক হিসেবে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মো. আয়নুর ইসলাম ও এমদাদুল হকের নাম জানা গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে ত্রিপল ও টিন দিয়ে ঘেরা একটি স্থাপনার ভেতরে দুটি চুলা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব চুলায় কাঠ ও কয়লার আগুনে পুরাতন ব্যাটারির প্লেট পুড়িয়ে সীসা তৈরি করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, দিনের বেলায় কারখানাটিতে তেমন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম দেখা যায় না। তবে সন্ধ্যার পর ট্রাকে করে গোডাউন থেকে পুরাতন ব্যাটারির প্লেট এনে চুলায় পোড়ানো হয়। তাদের দাবি, সন্ধ্যা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত চলে এ কার্যক্রম।এলাকাবাসীর অভিযোগ, ব্যাটারির প্লেট পোড়ানোর সময় ঝাঁজালো ধোঁয়া ও দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ২ থেকে ৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ ধোঁয়ার প্রভাব অনুভূত হয় বলেও দাবি তাদের। এতে চোখ ও মুখ জ্বালা করা, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়াসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন।
স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিদের আশঙ্কা, এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিষাক্ত ধোঁয়া ও বর্জ্যের কারণে আশপাশের কৃষিজমি ও জলাশয়ের পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
গবাদিপশু নিয়ে কৃষকদের উদ্বেগ
কারখানার আশপাশের কৃষকদের মধ্যে গবাদিপশুর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের ভাষ্য, মাঠের ঘাস ও ধানের খড় গবাদিপশুকে খাওয়াতে এখন তারা চিন্তিত। কারখানার ধোঁয়া ও ছাই ঘাস, ফসল ও খড়ের ওপর জমে গেলে তা গবাদিপশুর শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন তারা। এ কারণে গবাদিপশু অসুস্থ হওয়া কিংবা মারা যাওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন অনেক কৃষক।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, পুরাতন ব্যাটারি পোড়ানোর মাধ্যমে সীসা তৈরির কার্যক্রম পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারখানাটির পরিবেশগত ছাড়পত্র, অনুমোদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
শ্রমিকদের বক্তব্য
কারখানার শ্রমিকদের কাছে এভাবে কাজ করার কারণে কোনো সমস্যা হয় কি না জানতে চাইলে তারা বলেন, “একটু-আধটু সমস্যা হলেই কী করার আছে? পেটের দায়ে কাজ করি।”
প্রশাসনের অনুমোদন রয়েছে কি না জানতে চাইলে শ্রমিকরা দাবি করেন, “থানা-পুলিশ তেমন কিছু বলে না। তবে উপজেলা প্রশাসন, এসিল্যান্ড বা পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজনকে কেউ জানালে তারা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারখানা বন্ধ করে দেয়।”
মালিকের স্বীকারোক্তিকারখানার মালিক হিসেবে পরিচিত মো. আয়নুর ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের কোনো কাগজপত্র নেই। সবাইকে ম্যানেজ করে কারখানা চালাই। আমাদের কারখানার দেখাশোনা শাকিল ও মমিন দেখে। তাদের সঙ্গে কথা বলেন।”
অভিযোগের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “নিউজ করলে করেন, সমস্যা নেই। এই কারখানার টাকা আমরা বিভিন্ন মহলে দিয়েই কাজ করি।”তবে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে শাকিল তালুকদার ও মোমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, “এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুতই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে কারখানাটির বৈধতা যাচাই, পরিবেশগত ছাড়পত্র পরীক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিদর্শন এবং কারখানাটির কারণে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে কি না—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।তাদের দাবি, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট মালিক ও পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি কৃষিজমি, জলাশয়, ফসল ও গবাদিপশুর সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়রা জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মন্তব্য করুন