রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
নদীর এপার থেকে ওপার—মাঝখানে শুধু জলরেখা। সেই জলরেখার বুক চিরেই প্রতিদিন এগিয়ে যায় ছোট্ট একটি খেয়া। নৌকায় বসে থাকে বই-খাতা হাতে স্কুলপড়ুয়া শিশুরা। কারও চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কারও মুখে বন্ধুর সঙ্গে স্কুলের গল্প। অথচ সেই স্বপ্নযাত্রার নিচেই থাকে অনিশ্চয়তার গভীর জল।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার নলকা ইউনিয়নের তিননান্দিনা এলাকায় ফুলজোড় নদীর ওপর নেই কোনো স্থায়ী সেতু। দীর্ঘদিন ধরে খেয়া নৌকাই এখানকার মানুষের একমাত্র পারাপারের পথ। ফলে প্রতিদিন নদী পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। বর্ষায় নদীর পানি ও স্রোত বাড়লে সেই পথ হয়ে ওঠে আরও ভয়ংকর।
নদীর ঘাটে নৌকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দেখে বোঝার উপায় নেই—তাদের ছোট্ট শরীরের ভেতর কত বড় সাহস জমা থাকে। স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়ে তারা অপেক্ষা করে খেয়া আসার। নৌকা এলে গাদাগাদি করে উঠে পড়ে। ওপারের ঘাটে পৌঁছানোর পর আবার শুরু হয় স্কুলের পথ। নৌকা না পাওয়া গেলে কখনো ঘাটেই কেটে যায় মূল্যবান সময়।
বর্ষায় ফুলজোড়ের রূপ বদলে যায়। শান্ত নদী তখন স্রোতের ভাষায় কথা বলে। কালো মেঘ, বৃষ্টি আর ঢেউয়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে পারাপারের শঙ্কা। সন্তান নদীর ওপারে নিরাপদে পৌঁছেছে কি না—এই দুশ্চিন্তায় থাকেন অভিভাবকেরা। আবার স্কুল ছুটির পর বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা যেন শেষ হয় না।
তিননান্দিনা হাইস্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. এনামুল হক মাস্টার বলেন, ফুলজোড় নদীর ওপর সেতু না থাকায় শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হয়। বর্ষায় পানি ও স্রোত বাড়লে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দুই পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যারও সমাধান হবে।
তিননান্দিনা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মতিন ও আব্দুল হামিদ বলেন, বর্ষাকালে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে নৌকায় পারাপার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ঝড়-বৃষ্টির সময় ভয় আরও বাড়ে। কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে সবাইকে এই পথেই চলতে হয়।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সিফাত হোসেন ও সুমাইয়া খাতুন জানায়, প্রতিদিন খেয়া নৌকায় নদী পার হয়ে স্কুলে যেতে হয়। বর্ষায় নদীতে পানি ও স্রোত বেশি থাকলে ভয় লাগে। একটি সেতু হলে তাদের স্কুলে যাতায়াত অনেক সহজ ও নিরাপদ হবে।
অভিভাবক মো. আলমাহমুদ বলেন, সন্তানদের নদী পার হয়ে স্কুলে পাঠাতে প্রতিদিনই দুশ্চিন্তা হয়। কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই এখানে সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।
রায়গঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক তালুকদার বলেন, তিননান্দিনা এলাকায় ফুলজোড় নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে সেতু নির্মাণের কার্যক্রম নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, সেতু নির্মাণ হলে শুধু শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতই নিশ্চিত হবে না; কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসাসেবা ও দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগেও আসবে বড় পরিবর্তন।
ফুলজোড়ের খেয়াঘাটে তাই প্রতিদিন শুধু নৌকা চলে না—চলে অপেক্ষা। অপেক্ষা একটি নিরাপদ পথের, একটি স্থায়ী সেতুর। বই-খাতা হাতে যে শিশুরা আজ নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে স্কুলে যাচ্ছে, তাদের স্বপ্ন যেন একদিন আর স্রোতের ওপর নির্ভরশীল না থাকে—এটাই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।
মন্তব্য করুন